দেশে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার ব্যাপারে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় (full judgment) প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি শুধু নয়, বরং এক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেশের নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি স্বচ্ছতা ও তথ্য-ভিত্তিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। নিচে রায়ের সব গুরুত্বপূর্ণ দিক বিস্তারিতভাবে তুলে দেওয়া হলো
রায়ের মূল নির্দেশ ও প্রেক্ষাপট:
১) রায়ের উদ্দেশ্য ও ভিত্তি:
হাইকোর্ট একটি রিট আবেদন (writ petition)-এর ওপর গত ডিসেম্বর ২০২৫-এ শুনানি শেষে এই রায় দিয়েছেন। রিটটি ২০২১ সালের মার্চে দায়ের করা হয়েছিল, যেখানে আবেদনকারীরা উল্লেখ করেছিলেন যে বিবাহ-তালাক নিবন্ধন এখনও কাগজভিত্তিক (অনালগ) ব্যবস্থা অনুসারে হয়, যেটি:
এজন্য হাইকোর্ট পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
২) কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
হাইকোর্ট রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
✔ সমস্ত বিবাহ ও তালাকের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাধ্যতামূলক ভাবে নিবন্ধন করতে হবে।
✔ ডিজিটাল ডাটাবেস হচ্ছে একটি কেন্দ্রীভূত, যাচাইযোগ্য, স্বচ্ছ ও সহজ অ্যাক্সেস যোগ্য ব্যবস্থা।
✔সরকারকে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে রিপোর্ট দাখিল করতে হবে আদালতে।
এতে বিবাহ-তালাক সম্পর্কিত তথ্যের অনলাইন সংগ্রহ, যাচাই ও শেয়ার যোগ্য সিস্টেম গড়ে তোলা হবে যাতে সাধারণ নাগরিক, আইনগত সংস্থা ও প্রশাসন সহজেই অ্যাক্সেস পেতে পারে।
রায়ে যে সব গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলা হয়েছে:
১) বিদ্যমান অনালগ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা:
হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেছেন যে বর্তমানে যেহেতু পদ্ধতিটি কাগজভিত্তিক, তাই—
✔ তথ্য যাচাই করা কঠিন
✔ একটি ব্যক্তির একাধিক বিবাহ বা তালাক-সম্পর্কিত তথ্য লুকানো যায়
✔ একাধিক নথি মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন
✔ বাল্যবিবাহ, প্রতারণা ও ভুল-ত্রুটির সুযোগ বেশি থাকে
২) মানবাধিকার ও সংবিধান গত গুরুত্ত্ব:
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনালগ সিস্টেমের কারণে মানুষের মানবাধিকার ও সংবিধান গত অধিকার(Articles 31 ও32) ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে, কারন তথ্য সীমাবদ্ধ ও যাচাই-যোগ্য নয়। ডিজিটাল সিস্টেম মানবাধিকার, আইনি স্বচ্ছতা ও সাধারণ মানুষের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে।
ডিজিটাল সিস্টেমের সম্ভাব্য উপকারিতা:
হাইকোর্ট-এর রায়ে যেসব সুবিধা আগ্রহভরে তুলে ধরা হয়েছে:
১) প্রতারণা কমবে:
ডিজিটাল ডাটাবেস থাকার ফলে একাধিক বা গোপন বিবাহ ও তালাকের তথ্য আগেই যাচাই করা যাবে, যা প্রতারণা ও নথি গোপন করার সুযোগ কমাবে।
২) নারীর সামাজিক ও আইনি নিরাপত্তা বৃদ্ধি:
ডিজিটাল তথ্য থাকার ফলে নারীরা তাদের জন্য উপযুক্ত আইনি সুরক্ষা পাবে এবং ভুল তথ্য বা লুকোনো ইতিহাস প্রকাশ পাবে।
৩) নাগরিকদের সুবিধা ও স্বচ্ছতা:
সাধারণ নাগরিক অনলাইনে বিবাহ/তালাক তথ্য যাচাই, ডাউনলোড বা প্রিন্ট করতে পারবে, এবং প্রশাসনিক কাজ সহজ হবে।
৪) শিশু ও পারিবারিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা:
ডিজিটাল তথ্যের ফলে সন্তানের আইডেন্টিটি বা পরিবার-সম্পর্কিত আইনগত সিদ্ধান্ত আরও সহজে ও সুন্দরভাবে করা সম্ভব হবে।
সরকারের পরবর্তী করণীয়:
হাইকোর্ট শুধু নির্দেশ দিয়েছে প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল করতে হবে বরং এতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও ই-সেবা স্থাপন করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিবাহ/তালাক নিবন্ধক, কাজী বা পজিষ্ট্রি অফিসের কর্মকর্তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য আপলোড করবেন।
নাগরিকরা অনলাইনে তথ্য যাচাই ও সংগ্রহ করতে পারবেন।
সংক্ষেপে: রায়ের সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | নির্দেশ |
| রায়ের উদ্দেশ্য | বিবাহ ও তালাক ডিজিটাল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা |
| রিট দাখিল | মার্চ ২০২১ |
| শুনানি ও রায় | ডিসেম্বর ২০২৫ |
| বেঞ্চ | বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসান |
| সিস্টেম | অনলাইন, যাচাইযোগ্য, স্বচ্ছ, কেন্দ্রীয় ডাটাবেস |
| মানবাধিকার প্রভাব | অধিক তথ্য স্বচ্ছতা ও আইনি নিরাপত্তা বৃদ্ধি |
Leave a Reply